বাংলা শব্দের সন্ধানে

ট্যাংরা / তপসিয়া / ট্যানারি / টিয়ান / তুর্কি

Advertisements

অসিত দাস। সংবাদ প্রতিদিন ক্রোড়পত্রিকা রোববার (৩০/এপ্রিল/২০১৭)। নেমপ্লেট। ট্যাংরা।

বেলেঘাটা, সল্টলেকের কাছাকাছি ট্যাংরা অঞ্চলটি পূর্ব কলকাতার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যপূর্ণ জায়গা। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ফারুকসিয়ার প্রদত্ত ফরমানে উল্লিখিত কলকাতার প্রান্তবর্তী ৩৮টি গ্রামের অন্যতম ছিল এই ট্যাংরা। আবার ডিহি এন্টালি তৈরি হয়েছিল যে পাঁচটি অঞ্চল নিয়ে, তার অন্যতম ছিল ট্যাংরা। ট্যাংরা ও তপসিয়া যখন ১৭১৭-এ ৩৮টি গ্রামের মধ্যে উল্লিখিত, তখন স্বভাবতই প্রাচীন কলকাতার খালবিল ও পুকুরে ভরা জলাজংলা চেহারায় মাছের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তপসিয়ার মতো ট্যাংরাও কি তাহলে একটি বিশিষ্ট মাছের নাম থেকেই এসেছে? কলকাতা বিশেষজ্ঞগণ কিন্তু স্থাননামের ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে মাছকে বরাবর এড়িয়ে গিয়েছেন। ট্যাংরার ব্যুৎপত্তিতে সর্বত্রই চিনা সম্প্রদায়ে ট্যানারি বা চামড়া প্রক্রিয়াকরণ শিল্পকেই টেনে আনা হয়েছে। ট্যানারি থেকেই নাকি এসেছে ট্যাংরা। কলকাতার আদি বাসিন্দাদের মধ্যে চিনারা সত্যিই ছিলেন কি না, সেটা অবশ্য বিতর্কের বিষয়। বস্তুত হাক্কা-চাইনিজ সম্প্রদায় ট্যাংরায় বসবাস করছেন দেড়শো-দু’শো বছরের ওপর। ট্যাংরামাছ ও ট্যানারি শিল্প ছাড়া আর কিছু থেকে ট্যাংরার নাম আসতে পারে কি না, চিন্তা করতে করতে ট্যাংরার প্রাচীন আর্মেনিয়ান চার্চের কথা মনে পড়ল। ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দে তৈরি এই হোলি ট্রিনিটি চার্চ পুরনো কলকাতার অন্যতম প্রধান চার্চ। আর্মেনিয়ানদের সঙ্গে তুর্কিরাও এসেছিল কলকাতায়। ১৭৯৫-এ বেঙ্গলি থিয়েটার-এর প্রতিষ্ঠাতা গেরাসিম স্টেপানোভিচ লেবেডেভ জাতিতে ছিলেন রাশিয়ান। রাশিয়া ও বুলগেরিয়া পাশাপাশি দেশ। কলকাতার প্রাচীন অধিবাসীদের মধ্যে আর্মেনিয়ানরাই অগ্রগণ্য। তুর্কি ও বুলগেরিয়ানদের এক বিশিষ্ট দেবতার নাম ‘ট্যাংরা’। ইনি মহাকাশের দেবতা। চিনারাও এই দেবতার পুজো করত। এই আকাশ-দেবতাকে তারা ‘টিয়ান’ বলে ডাকে। তুর্কি-বুলগেরিয়ান দেবতা ‘ট্যাংরা’-ই হোক বা চিনাদের সর্বশক্তিমান আকাশ-দেবতা ‘টিয়ান’ থেকেই হোক, ‘ট্যাংরা’ স্থাননামটি আসতেই পারে। আর্মেনিয়ানরা যে ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দের আগে থেকেই কলকাতায় ছিল, তা অধুনা গবেষণায় প্রমাণিত। তাদের সঙ্গে তুর্কিদের বন্ধুত্ব ছিল একসময়। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে আর্মেনিয়ান জেনোসাইড-এ কয়েক লক্ষ আর্মেনিয়ানকে হত্যা করে তুর্কিরা। তারপর থেকেই দু’দেশের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। ‘তরুণ তুর্কি’ লব্‌জটি বাঙালি তো এমনি এমনি গ্রহণ করেনি! কথায় কথায় আমরা ‘তুর্কিনাচন’ নাচিয়েও ছাড়তে পারি! বুলগেরীয় বা তুর্কি দেবতা ‘Tangra’ থেকে ‘ট্যাংরা’ নামটি তাই আসতেই পারে। ট্যাংরার প্রাচীন ‘চিনা কালীবাড়ি’-তে কি ‘টিয়ান’ নামক আকাশদেবতারও মূর্তি বা ফ্রেসকো থাকতে পারে?

Advertisements

Advertisements